মনসাপূজার প্রচলন কিভাবে?
আদ্যাশক্তি মহামায়ার অনন্ত তাঁর রূপ, অনন্ত তাঁর বৈচিত্র্য, অনন্ত তাঁর বৈভব। তাঁর কোন নিদিষ্ট মূর্তি নেই। সাধকের কল্যাণার্থে বিভিন্ন রূপে তিনি প্রকাশিত হন। মা আদ্যাশক্তির অনন্ত রূপের মধ্যে বঙ্গদেশে খুবই জনপ্রিয় পূজিত বিগ্রহ হলেন দেবী মনসা। যিনি মহাজ্ঞানযুক্তা, জ্ঞানিদের প্রধানা, শ্রেষ্ঠা, সিদ্ধগণের অধিষ্ঠাতৃদেবী, সিদ্ধিস্বরূপিনী এবং সিদ্ধিদায়িণী। পৌরাণিক এবং লৌকিক দুটি উৎসেই অসংখ্য গল্প কাহিনী রচিত হয়েছে দেবীর মাহাত্ম্যকে কেন্দ্র করে। দেবী মনসা যে
ব্রহ্মস্বরূপিনী আদ্যাশক্তি; বিষয়টি দেবীভাগবতের নবমস্কন্ধের আটচল্লিশতম অধ্যায়ের শুরুতেই আমরা এর উল্লেখ পাই। সেখানে বিস্তারিত দেবীমাহাত্ম্য বর্ণিত আছে।
শ্বেতচম্পকবর্ণাভাং রত্নভূষণভূষিতাম্।
বহ্নিশুদ্ধাংশুকাধানাং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্।।
মহাজ্ঞানযুতাং তাঞ্চ প্রবরজ্ঞানিনাং বরাম্।
সিদ্ধাধিষ্ঠাতৃদেবীঞ্চ সিদ্ধাং সিদ্ধিপ্রদাং ভজে।।
(দেবীভাগবত: নবমস্কন্ধ, ৪৮.২-৩)
"যাঁর দেহের বর্ণ শ্বেতচম্পক ফুলের মত শুভ্র, অঙ্গে বিবিধ প্রকারের রত্নভূষণ শোভা পাচ্ছে, যিনি অগ্নিবর্ণের রক্তিম বস্ত্র পরিধান করে আছেন; যিনি মহাজ্ঞানযুক্তা, জ্ঞানীদের প্রধানা, শ্রেষ্ঠা, সিদ্ধগণের অধিষ্ঠাতৃদেবী, সিদ্ধিস্বরূপিনী এবং সিদ্ধিদায়িনী তাঁর সদা ভজনা করি।"
স্বয়ং প্রকাশিতা আদ্যাশক্তি দেবী নাগ ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত জীবদের রক্ষার্থে পুরাকালে আবির্ভূত হন। নাগের আক্রমণ হতে রক্ষার জন্যে, কশ্যপ মুনি মানব রক্ষায় যখন চিন্তিত মনে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন, তখন কাশ্যপ মুনির চিন্তিত মনের মাঝেই দেবী প্রকাশিত হন। তাঁর কোন জন্ম নেই, জীবদের রক্ষার্থে তিনি আবির্ভূত হয়ে রক্ষা করেন, লীলা করেন।অনন্ত রূপধারিণী লীলাময়ী তিনি। চিন্তার অতীত তাঁর স্বরূপ, তিনি যতটা কৃপা করে জানান ; মায়াবদ্ধ জীব ততখানিই তাঁকে জানতে পারে।
পুরা নাগভয়ক্রান্তা বভূবুর্মানবা ভুবি ।
গতাস্তে শরণং সর্বে কশ্যপং মুনিপুঙ্গবম্ ।।
মন্ত্রংশ্চ সসৃজ্যে ভীতঃ কশ্যপো ব্রহ্মণান্বিতঃ ।
বেদবীজানুসারেণ চোপদেশেন ব্রহ্মণঃ ।।
মন্ত্রাধিষ্ঠাতৃদেবীং তাং মনসা সসৃজ্যে তথা ।
তপসা মনসা তেন বভূব মনসা চ সা ।।
(দেবীভাগবত: নবমস্কন্ধ, ৪৮.১১-১৩)
"পুরাকালে পৃথিবীতে নাগের ভয়ে ভীত হয়ে মনুষ্যগণ জীবন রক্ষার্থে মুনিশ্রেষ্ঠ কশ্যপের শরণাপন্ন হন। ভীত মনুষ্যদের বর্ণনা শুনে, কশ্যপ মুনিও ভীত হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তখন ব্রহ্মার আদেশে কশ্যপ মুনি নাগভয় থেকে মুক্তির জন্য এক বেদোক্ত বীজ অনুসারে জপ-ধ্যান শুরু করলেন। তৎকালে মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসা ধ্যানরত কাশ্যপ মুনির মন হতে আবির্ভূত হলেন; তাই তাঁর নাম হল মনসা।"
আদ্যাশক্তির মহামায়ার অনন্ত রূপের মধ্যে সৃষ্টি স্থিতি এবং লয়ের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে পূজিত সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং কালী। এ সকল প্রধান রূপ থেকেই মনসা দেবী অভিন্ন। তাই মনসাদেবীর দ্বাদশাক্ষর বীজমন্ত্রে দেবীদুর্গা, লক্ষ্মী, কালী এবং সরস্বতী এ সকলেরই অধিষ্ঠান দেখা যায়। এ কল্পতরু স্বরূপ বীজমন্ত্রটি হল: "ওঁ হ্রীং শ্রীং ক্লীং ঐং মনসাদেব্যৈ স্বাহা।" তাই কেউ দেবীকে সদা চিন্তন করেও মুক্তিলাভ করতে পারে। তিনি ব্রহ্মস্বরূপিনী কুলকুণ্ডলিনী শক্তি। নাগ তাঁর গায়ের যজ্ঞোপবীত। নাগের সাথে যোগের এবং যোগীর নিকট সম্পর্ক। তাই শিবের গায়েও নাগের যজ্ঞোপবীত দেখা যায়। নাগ গুহাবাসী, শীতের কয়েকটি মাস, শুধু বায়ু ভক্ষণ করেই বা সামনে যা খাবার আসে তাই ভক্ষণ করে অযাচক বৃত্তিতে তাই গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। এমন আচরণ পর্বত গুহাতে বসবাসকারী একজন যোগীর জীবনেও দেখা যায়। তাই রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর 'অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব' নামক সুবিখ্যাত গ্রন্থে পদ্মপুরাণোক্ত দেবী মনসার একটি ধ্যানমন্ত্রে উদ্ধৃত করেছেন। সে ধ্যানমন্ত্রটি আজও বহুল ব্যবহৃত দেবীর পূজায়। ধ্যানমন্ত্রটিকে দেবীকে যায়, 'কামরূপাম্' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাযোগিনী দেবী কামেশ্বরী রূপে প্রত্যেকটি জীবকে নাগরূপা কুলকুণ্ডলিনী শক্তি দ্বারা জীবের কামনা বাসনা থেকে মুক্ত করেন।
দেবীমম্বামহীনাং শশধরবদনাং চারুকান্তিং বদন্যাং
হংসারূঢ়ামুদারামরুণিতবসনাং সর্বদাং সর্বদৈব।
স্মেরাস্যাং মণ্ডিতাঙ্গীং কণকমণিগণৈর্নাগরত্নৈ-র্বন্দেহং সাষ্টনাগামুরুকুচযুগলাং ভোগিনীং কামরূপাম্।।
"সর্পকুলের জননী, চন্দ্রবদনা, সুন্দর কান্তি বিশিষ্টা, বদন্যতাগুণসম্পন্না, হংসবাহিনী, উদার স্বভাবা, রক্তবস্ত্র পরিহিতা, সর্বদা অভিষ্ট প্রদায়িনী, সহাস্য বদনা, কণকমনি এবং নাগশ্রেষ্ঠগণের দ্বারা ভূষিতাঙ্গী,অষ্টনাগ পরিবৃতা, উন্নত কুচযুগল শোভিতা, ভোগিনী, কামরূপা দেবীকে সদা বন্দনা করি।"
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতিখণ্ডে দেবীর সামবেদোক্ত দেবীপূজা বিধানের সাথে দেবীর ধ্যানমন্ত্র এবং দেবীর কল্পতরুবৃক্ষের ন্যায় দ্বাদশাক্ষর যুক্ত মূলমন্ত্রও বর্ণিত হয়েছে। সে মন্ত্রের মন্ত্রসিদ্ধি লাভ করলে জীব, ধন্বন্তরিসদৃশ হয়। তখন তার কাছে ভয়ংকর হলাহল বিষ পর্যন্তও অমৃতের ন্যায় সুখকর হয়।
নারায়ণ উবাচ।
পূজাবিধানং স্তোত্রঞ্চ শ্ৰুয়তাং মুনিপুঙ্গব ।
ধ্যানঞ্চ সামবেদোক্তং দেবীপূজাবিধানকম্ ॥ শ্বেতচম্পকবর্ণাভাং রত্নভূষণভূষিতাম্। বহ্নিশুদ্ধাংশুকাধানাং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্ ॥ মহাজ্ঞানযুতাঞ্চৈব প্রবরাং জ্ঞানিনাং সতীম্। সিদ্ধাধিষ্ঠাতৃদেবীঞ্চ সিদ্ধাং সিদ্ধিপ্রদাং ভজে ॥
ইতি ধ্যাত্বা চ তাং দেবীং মূলেনৈব প্রপূজয়েৎ । নৈবেদ্যৈৰ্ব্বিবিধৈদীপৈঃ পুষ্পৈর্ধূপানুলেপনৈঃ ॥
মূলমন্ত্রশ্চ বেদোক্তো ভক্তানাং বাঞ্ছিতপ্রদঃ ।
মুনে কল্পতরুর্নাম সুসিদ্ধো দ্বাদশাক্ষরঃ ॥
ওঁ হ্রীং শ্রীং ক্রীং ঐং মনসাদেব্যৈ স্বাহেতি কীৰ্ত্তিতঃ ।
পঞ্চলক্ষজপেনৈব মন্ত্রসিদ্ধির্ভবেন্নৃণাম্ ॥ মন্ত্রসিদ্ধির্ভবেদ্যস্য স সিদ্ধো জগতীতলে।
শুধাসমং বিষং তস্য ধন্বন্তরিসমো ভবেৎ ॥
(ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ : প্রকৃতি খণ্ড, ৪৬.১-৭)
"নারায়ণ বললেন, হে মুনিবর! মনসাদেবীর পূজাবিধি, সামবেদোক্ত ধ্যান প্রভৃতি পূজার উপযোগী বিষয় শ্রবণ কর। যাককর বর্ণ শ্বেতচম্পকসদৃশ শুভ্র, অঙ্গে নানাপ্রকার বহুমূল্য সুবর্ণভূষণ শোভিত, পরিধানে বহ্নিশুদ্ধ বস্ত্ৰ ; যিনি নাগরূপ যজ্ঞোপবীত ধারণ করে আছেন ; যিনি মহাজ্ঞানযুক্তা এবং জ্ঞানিগণের প্রধানা, পতিব